নন্দিকারের ৪২তম ন্যাশনাল থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল ২০২৫

নন্দিকারের ৪২তম ন্যাশনাল থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল ২০২৫




শিবাশিস মুখোপাধ্যায়


Academy গৃহে — “The Show Must Go On…”

আসন্ন উৎসবকে সামনে রেখে নভেম্বরের এই শহরে এক দীর্ঘ, প্রত্যাশাময় শ্বাস।  নভেম্বরের এই হালকা ঝাপসা শীতে, কলকাতা যেন অপেক্ষার ফিতে গায়ে জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে—রাতের ঠান্ডা, বইমেলার আগাম গন্ধ, আর মঞ্চশিল্পের সেই পরিচিত উত্তেজনা। Academy গৃহের লাল-ইটে-ঢাকা সেই প্রাচীন অথচ তারুণ্যে টইটম্বুর বাড়িটা এই মুহূর্তে যেন মৃদু আলোয় জ্বলে উঠছে। কারণ সামনে আসছে—নন্দিকারের ৪২তম ন্যাশনাল থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল, ১৬ থেকে ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫। আর এ যেন শুধু একটি উৎসব নয়—এ এক যাত্রা, এক শ্রদ্ধার্ঘ্য, এক পুনর্জন্ম—অভিনয়, দর্শক, মঞ্চ এবং মানুষের ভেতরের অদৃশ্য আলোকে কেন্দ্র করে।


এখনো উৎসব শুরু হতে প্রায় তিন সপ্তাহ বাকি। কিন্তু আমরা যারা—নাটক দেখি, নাটকের গন্ধ নিই, শব্দের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলি—তাদের হৃদয়ে উৎসব শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। নন্দিকারের এই বার্ষিক উৎসব শুধু নাটক দেখার মহোৎসব নয়—এ হলো শেখার, বোঝার, অনুভবের, এবং নিজের ভিতরকার শিল্পীকে জাগিয়ে তোলার এক দীর্ঘ দশ দিনের সাধনা। এ বছর সম্পূর্ণ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হবে Academy গৃহে, যার প্রতিটি করিডর, প্রতিটি হল, প্রতিটি খালি চেয়ার যেন ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন এক ইতিহাসের। Academy গৃহ মানেই এক বিশেষ গন্ধ—কাঠের, রংয়ের, আলোয়-ছায়ার মিশ্রণ; যেন পুরোনো দিনের নাট্যগুরুরা এখনো নিঃশব্দে এদিক-ওদিক হাঁটছেন। মঞ্চে পা রাখলে আলো-ঝলমল করা নীরবতা যেন বলে—“এখানে যা ঘটবে, তা কেবল চোখে দেখা নয়; এটি আত্মার দ্বারা শ্রুত।”


ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ সকাল থেকেই Academy গৃহ ব্যস্ত থাকবে— কর্মীরা আলো ঝুলাচ্ছেন, সাউন্ড চেক হচ্ছে, স্ক্রিপ্ট হাতে শিল্পীরা ধীরে ধীরে গলা গরম করছে। দর্শকরা একে একে ঢুকছে করিডরে, কেউ বুকের কাছে টিকিট চেপে ধরে আছে, কেউ আবার আলোচনায় তর্ক করছে কোন নাটকটা এবছর ‘লিগ্যাসি’ হয়ে থাকবে। Academy গৃহের বাতাসে তখন মিশে যাবে—চায়ের কাপের বাষ্প, অভিনেতাদের নিঃশ্বাস, আলো-অনুশীলনের ফিসফিস শব্দ, আর শিক্ষার্থীদের অস্থির আগ্রহ।


এই উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ প্রতিদিন সকালে অনুষ্ঠিত লাইটিং, সাউন্ড, বডি-মুভমেন্ট এবং ভয়েস ট্রেনিং সেশন। ছাত্রছাত্রীরা শিখবে—কিভাবে মঞ্চের আলো শুধু দৃশ্যকে আলোকিত করে না, বরং আবেগের খণ্ডচিত্র তৈরি করে; কিভাবে কণ্ঠ শুধু সংলাপ বহন করে না, বরং নাটকের দর্শন টেনে আনে মঞ্চে।


১৬ ডিসেম্বর থেকে অজস্র নাটক মঞ্চস্থ হবে—

কেউ বিদেশ থেকে আসবে, কেউ ভারতীয় থিয়েটারের পরীক্ষামূলক ধারাকে এগিয়ে আনবে।


প্রতিটি রাত যেন এক-একটি আত্ম-অনুসন্ধানের সেশন। প্রতিটি নাটক একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেবে দর্শকের হৃদয়ে—আমি কে? সমাজ কোথায়? সম্পর্ক কী? সত্য কি নাকি অভিনয়ই সত্যের আসল ভাষা?


আমরা দেখব—

— দর্শকের নীরব চোখ

— শিল্পীর পরিশ্রান্ত ঘাম

— মঞ্চের আলো

— আর ছায়ায় ফেলে রাখা মানুষের সত্যিকারের গল্প।


নন্দিকারের উৎসব সবসময়ই মানবিকতার উৎসব।

এখানে অভিনয়শিল্পী আর দর্শকের মধ্যে কোন দেয়াল নেই।


ফেস্টিভ্যালের প্রতিটি রাত শেষে Academy গৃহের করিডর দীর্ঘ আলোচনায় গমগম করবে।

কেউ বলবে— “আজকের নাটক আমার শৈশব মুছে দিল।” কেউ বলবে— “আজকের চরিত্রটা আমাকে বদলে দিল।” কেউবা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে বুঝবে — নাটকের ভাষা কত গভীর, কত মানবিক। আর ওই সময়ে Academy গৃহের কাঠের সিঁড়িগুলোও যেন আমাদের মতই শুনবে, বোঝবে।


শেষ দিনের রাতে ঘোষণা হবে পুরস্কার—


🏅 চন্দন সেনকে বিশেষ সম্মান, তার অভিনয়, তার দর্শন, তার জীবন্ত চরিত্রসৃষ্টি—এই উৎসব তাকে নিবেদন করছে এক বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য। আরো থাকবে


🏆 শ্রেষ্ঠ নাটক

🏆 শ্রেষ্ঠ পরিচালক

🏆 বিশেষ জুরি উল্লেখ

🏆 সেরা অভিনেতা/অভিনেত্রী


Academy গৃহের হল তখন দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাবে শিল্পকে, শিল্পীর অভিভাবকদের, আর সেই অদৃশ্য শক্তিকে যাকে আমরা বলি—থিয়েটারের আত্মা।


এ আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি — নভেম্বরের আজকের এই দিন থেকে


আমি এখন নভেম্বরের এই ম্লান-রোদ্দুর বিকেলে বসে ভাবছি—

কী দেখব?

কী শিখব?

কেমন আলো ছুঁয়ে যাবে আমাকে?


মনে হচ্ছে—

১৬ থেকে ২৬ ডিসেম্বর, প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি Academy গৃহে গেলে সেই কাঠের মঞ্চ আমাকে ডাকবে।

আমাকে বলবে—

“এসো, বসো, দেখো।

তোমার হৃদয়ের ভিতরে যে গল্পটা আটকে আছে,

সেটা হয়তো আজকের নাটক খুলে দেবে।”


আমি অপেক্ষা করছি— দেবশঙ্করের কণ্ঠের গর্জন শুনতে, সোহিনীর চোখের নিষাদ রাগ দেখতে,

চন্দন সেনের চরিত্রের গভীরে ডুবে যেতে।


আমি অপেক্ষা করছি—

এমন এক উৎসবের জন্য

যেখানে নাটক হবে জীবনের আয়না,

আর দর্শক হবে তার ভিতরের মানুষটি।


নন্দিকার—১৯৬০ থেকে ২০২৫


২৯ জুন ১৯৬০, নন্দিকার জন্মেছিল। আজ ৬৫ বছর পরও “And still in adolescence…”


কারণ নন্দিকার বার্ধক্যে বিশ্বাস করে না— ওরা জানে শিল্পের বয়স হয় না। প্রশ্ন, প্রেম, প্রতিবাদ, বিশ্বাস—সবকিছু নিয়েই নন্দিকার আজও তরুণ।

এই ফেস্টিভ্যাল সেই তারুণ্যের উদযাপন।


ডিসেম্বর এলে Academy গৃহ আলোকিত হবে মানুষের আবেগে। থিয়েটারের আলো, সাউন্ড, অভিনয়—সব মিলিয়ে গড়ে উঠবে এক বিশাল মানবিক উপাখ্যান।

আর আমি—একজন সাধারণ দর্শক— এই উপাখ্যানের অংশ হতে অপেক্ষা করে আছি এই নভেম্বরের ঠান্ডা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে।


কারণ শেষ পর্যন্ত—

The Show Must Go On…

জন পড়েছেন

0/Post a Comment/Comments

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন